• সোমবার, ৩১ অগাস্ট ২০২৬, ০২:১৮ পূর্বাহ্ন

জুলাই গণঅভ্যুত্থান: সাম্প্রতিক ভাবনা

ড. মাহফুজুর রহমান আখন্দ / ১০৭ Time View
Update : সোমবার, ২০ জুলাই, ২০২৬

চব্বিশের জুলাই মানে নতুন এক ইতিহাস। প্রতিবাদ, আত্মত্যাগ আর ছাত্রজনতার বিজয়ের প্রতীক। ৩১ জুলাইয়ের ক্যালেন্ডারে ৩৬ জুলাই পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে নতুন তারিখ। ৩২ থেকে ৩৬ জুলাই শুধুমাত্র একটি নতুন তারিখের বালখিল্যতা ছিলো না, বরং এটি ছিলো আন্দোলনের একটি জেদি টার্নিং ডেট। আন্দোলনের শক্ত হাতে হাল ধরে বিজয়ের হাওয়ায় পাল উড়িয়ে দেবার ইস্পাত কঠিন সিদ্ধান্ত। এই স্রোত অন্যায়ের বিরুদ্ধে। সাম্য আর অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে। অস্ত্র ছিল না, ছিল সাহস; বিপ্লবী চেতনা আর ন্যায্যতার স্বপ্ন। এই জুলাই ছিল বাংলাদেশের ইতিহাস থেকে আরেকটি কালো অধ্যায় মুছে ফেলার এক সংগ্রামী ঝড়। ন্যায্য অধিকার আদায়ের এক বজ্্রকঠিন আন্দোলন। কোটা আন্দোলন থেকে বৈষম্যহীন ও সমতাভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যাশিত প্রতিশ্রুতি। কোমলমতি শিক্ষার্থীদের খরস্রোতা ঢেউয়ে সর্বশ্রেণির গণমানুষের মুক্তির উচ্ছাসে এক কালবৈশাখী তাণ্ডব। জগদ্দল পাথরকে ভেঙে গুড়িয়ে দিয়ে নতুন স্বপ্নের সুখি বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে পাহাড়ের মতো দাঁড়িয়ে যাবার সাহসী তাণ্ডব। বৈরি বাতাসে লাগাম টানতে গিয়ে তাইতো শিক্ষার্থীদের কোমল আত্মার সাথে প্রাণ বিসর্জন দিতে হলো হাজারো মুক্তিকামী স্বপ্নবাজ মানুষকে। অবশেষে ফ্যাসিবাদের জননী পালিয়ে আত্মরক্ষা করলেন। এটাকে আমরা বলি ‘দ্য গ্রেট মাইগ্রেশন অব দ্য ফ্যাসিস্ট’। দুইটি বছর পেরিয়ে আজ পর্যালোচনার বিষয়, ইতিহাসের এই অধ্যায়ে কী পেয়েছে বাংলাদেশ, কতটা সফল হয়েছে বিপ্লবীরা!

ফ্যাসিবাদী দমননীতির বিরুদ্ধে রাজপথে এক কাতারে দাঁড়িয়েছিলো শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক ও শ্রমজীবী সর্বশ্রেণির মানুষ। শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা সেই গণআন্দোলন শুধু কোটা সংস্কারের দাবিতে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তা ছিল দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, অবিচার, বৈষম্য ও দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে একটি সাহসী জাতির সম্মিলিত প্রতিরোধ। এই আন্দোলন ছিল তরুণ প্রজন্মের জাগরণ। যেখানে তারা চেয়েছিল জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থা, ন্যায়বিচার, মর্যাদাপূর্ণ নাগরিক অধিকার এবং একটি মানবিক রাষ্ট্র। দলমতের ঊর্ধ্বে উঠে শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমেছিল, শুধুমাত্র বিবেকের তাড়নায়। কোনো রাজনৈতিক দলের নির্দেশে সরাসরি নয় বরং অন্যায়ের বিরুদ্ধে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করতেই তারা পথে দাঁড়িয়েছিল। রাজনৈতিক ছাত্র সংগঠনের অনেকেই সংযুক্ত হয়ে আন্দোলনকে বেগবান করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে। এই আন্দোলনে অনেকেই রক্ত দিয়েছেন, হারিয়েছেন প্রিয়জন, কেউ পঙ্গু হয়েছেন, কেউ এখনো হাসপাতালের বিছানায়। এসব ত্যাগ শুধু ব্যক্তিগত নয়, একটি প্রজন্মের সম্মিলিত আত্মদানের প্রতিচ্ছবি। তারা থেমে যায়নি, ভয়ে পিছু হটেনি। বরং তারা প্রমাণ করেছে, যখন অধিকার হরণ হয়, তখনই প্রতিবাদের জন্ম হয়। তাইতো বলা যায় ‘রক্তকণায় জ্বলছে আগুন ভোরের সূর্য লাল/ তরুণ-যুবার ত্যাগের বিজয় স্মরবে মহাকাল।’

জুলাইয়ের সেই অগ্নিঝরা সময়ে কাটানো হয়েছে কত নির্ঘুম রাত। সকালের শুভ্রতার সাথেই আন্দোলনে অংশগ্রহণের দৃঢ়চেতা মনোবল। প্রবল সাহসিকতা, বীরত্ব আর তীব্র প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের এক উত্তাল ঢেউ। ‘বুকের ভেতর দারুন ঝড়, বুক পেতেছি গুলি কর’। আবু সাঈদের প্রসারিত দুই বাহু ছড়িয়ে পড়েছে বিপ্লবীদের শরীরে। ‘ভাই, পানি লাগবে পানি’ মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধের প্রেমময়ী আত্মত্যাগী আহ্বান আবর্তিত হয়েছে বাংলাদেশের প্রতিটি জনপদে। তাইতো অগ্নিঝরা প্রতিরোধের কণ্ঠস্বর- ‘জেগেছে রে জেগেছে ছাত্রসমাজ জেগেছে, লেগেছে রে লেগেছে, রক্তে আগুন লেগেছে!’

এ কথা সত্য যে, বৈষম্যবিরোধী বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সর্বশ্রেণি-পেশার মানুষের জনগণের অংশগ্রহণের ফলেই সফল হয়েছে জুলাই বিপ্লব। এ বিপ্লবে যেসব পিতা-মাতা তাদের সন্তান হারিয়েছেন, তারা এখনো আশায় বুক বেঁধে আছেন বৈষম্যহীন ন্যায্যতার নতুন এক বাংলাদেশের প্রত্যাশায়। কিন্তু জুলাই বিপ্লবে সমর্থন দিয়ে মাঠে থাকা রাজনৈতিক দলগুলো এখন স্বার্থের জালে আটকা পড়ে নিজেদের মধ্যে বিভেদে লিপ্ত। এমনকি যারা জুলাই বিপ্লবের সামনে বা আড়াল থেকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, তারাও এখন নিজেদের মধ্যে সাফল্যের কৃতিত্ব ভাগাভাগি নিয়ে ব্যস্ত। অথচ এখনো জুলাই গণহত্যার বিচার হয়নি! খুন, ধর্ষণ কিংবা চাঁদাবাজিসহ পেশি শক্তির বড়াই থামেনি। ফিরে আসেনি ন্যায্যতা, বাস্তবায়িত হয়নি গণভোটের রায়, বাস্তবায়ন হয়নি জুলাইয়ের স্বপ্নসনদ।

সংগ্রামীরা জুলাইকে বিপ্লব হিসেবে নিয়েছিলাম। ফলে আমাদের প্রত্যাশার ব্যারোমিটার অনেক উঁচুতে। বিপ্লবের কাছে অনেক বড় চাওয়া থাকে। প্রতিষ্ঠিত হয় বিপ্লবী সরকার। বিপ্লবের পর সমাজ থেকে শুরু করে বহু জায়গার খোল-নলচেই পাল্টে যায়। সংবিধানের বাধ্যবাধকতা থাকে না। কার্যকারিতার তালিকায় থাকে ‘যেখানেই সংকট, সেখানেই পরিবর্তন।’ ‘যেখানেই বৈরিতা, সেখানেই নতুন আইন।’ কিন্তু তা হয়নি। জুলাইকে গ্রহণ করা হয়েছে গণঅভ্যুত্থান হিসেবে। ফলে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার মধ্যে এগিয়ে যেতে হচ্ছে। ইচ্ছে করলেই সংগ্রামীদের প্রত্যাশা বাস্তবায়ন সম্ভব করতে পারছেন না কতৃপক্ষ।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্র সংস্কার নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল- আইনের শাসন শক্তিশালী করা। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বৃদ্ধি। নির্বাচন ব্যবস্থার প্রতি জনআস্থা ফিরিয়ে আনা। মানবাধিকার ও নাগরিক স্বাধীনতার কার্যকর সুরক্ষা। দুর্নীতি দমন এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠা। এসব বিষয়ে কোন কোন প্রসঙ্গে প্রয়োগ-পদ্ধতিগত কিছুটা ভিন্নমত থাকলেও অধিকাংশ বিশ্লেষক একমত যে কার্যকর প্রতিষ্ঠান এবং জবাবদিহিমূলক শাসন একটি স্থিতিশীল রাষ্ট্রের অপরিহার্য শর্ত। অথচ সংস্কার, বিচার এবং জননিরাপত্তার বিষয়টি এখনো নিশ্চিত করতে পারেনি। না পেরেছে সংগ্রামীরা। না পেরেছে ইন্টেরিম গভর্নমেন্ট। না পারছে নির্বাচিত নতুন সরকার। রাজনৈতিক দলগুলো এ বিষয়ে কতটা সিরিয়াস সেটাও বিবেচ্য বিষয় হিসেবে গ্রহণ করতেই হবে।

সংস্কার প্রশ্নের চেয়েও নির্বাচন হয়ে উঠেছিলো মূখ্য বিষয়। ইন্টেরিম সময়ে আন্দোলনে যারা নেমেছিলো, তাদের প্রত্যেকেরই তো রাজনৈতিক এজেন্ডা ছিল। সেসব এজেন্ডা সহজেই বের হয়ে এসেছে। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় যারা ক্ষমতায় আসতে চেয়েছে, তাদের কথা বাদই দিলাম; যারা গণতন্ত্রকে পছন্দ করে না, তারাও কথা বলতে শুরু করেছিলো। তারাও গণতন্ত্রের নামে নির্বাচন ইস্যুকেই প্রধান বিষয় হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। আলহামদুলিল্লাহ, নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। এখন জুলাইয়ের উদ্দীপনায় সামনের দিকে নজর দেয়া বুদ্ধিমানের কাজ।

জুলাই বিপ্লবকে ঘিরে প্রায় দুই হাজারের বেশি মামলা হয়েছে। জীবন দিয়েছে প্রায় দুই হাজার মানুষ। জাতিসংঘের রিপোর্ট অনুযায়ী, প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। অথচ বিচারিক প্রক্রিয়ার কোনো উন্নতি এখনো খুব বেশি দৃশ্যমান হয়নি। আন্দোলনে অসংখ্য শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন। আন্দোলনে আহত একটি বড় অংশ আছেন রিকশাওয়ালা, পোশাককর্মীসহ নানা শ্রেণিপেশার খেটে খাওয়া মানুষ। তাদের অনেকেই সঠিক চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। তাদের অনেকেই এখনো ট্রমায় ভুগছেন।
নির্বাচন পরবর্তী নতুন সরকারের আমলে এসে ফ্যাসিবাদীরা নতুন মুখোশে চেহারা পরিবর্তন করছেন। তারা বিভিন্ন দলে ঢুকে পড়ছেন। তারা এখন নব্য দেশপ্রেমিক শক্তি। এই নব্যশক্তি মূলত তাদের পূর্ব ফ্যাসিবাদী আদর্শকেই সামনে নিয়ে আসতে চায়। তারা নামে বেনামে জুলাইযোদ্ধাদের হুমকি দিয়ে যাচ্ছেন। জুলাইকে নিয়ে নিয়ে রীতিমতো নোংরা এবং অশ্লীল মন্তব্য করে চলেছেন। অন্যদিকে ফ্যাসিবাদী স্বৈরাচার বাহ্যিকভাবে সরে গেলেও তাদের অনুসারী প্রেত্মারা এখনো সজাগ। তাদের বড় একটি অংশ কালাচারাল ফ্যাসিস্টদের কাঁধে ভর করেছেন। তাদের মুখ থেকে নিয়মিতভাবে জুলাইকে প্রশ্নবিদ্ধ করছেন। জুলাই যোদ্ধাদের লাঞ্ছিত করছেন। আক্রমণ করছেন। রীতিমতো হত্যার হুমকি দিয়ে যাচ্ছেন। এই নব্যশক্তি বিভিন্ন দলের মিটিংয়ে বক্তব্য শেষ করেন সেই পুরোনো ‘জয়বাংলা’ শ্লোগানে। সেই নব্যশক্তি এবং কালচারাল ফ্যাসিস্টরা এখন নতুন বাতাসে ভর করে জুলাইকে কলঙ্কিত করার নীলনকশা বাস্তবায়নে মরিয়া হয়ে মাঠে নেমেছে। অন্যদিকে জুলাইয়ের সাথীরা নিছক রাজনৈতিক স্বার্থে এই সেনসেটিভ বিষয়টিকে খানিকটা এড়িয়ে চলেছি কিংবা কেউ কেউ এনজয় করছি। ‘বিপ্লবীদের মাথায় যখন ঠোকর মারে কাক/ বলছো এটা ওদের বিষয় মার খাবে তো খাক।’ সত্যিকার অর্থে, ফ্যাসিবাদ ও স্বৈরাচারের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত অন্যায়কারী সকল ব্যক্তির বিচারের বিষয়ে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত না হলে পরিস্থিতি ভিন্নদিকে মোড় নিতে পারে বলে বিশেষজ্ঞ মহলের ধারণা।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে ঘিরে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে। প্রথমত, আন্দোলনের চেতনা কি রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণে প্রতিফলিত হচ্ছে? দ্বিতীয়ত, গণভোটের রায় কি বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে যাচ্ছে? তৃতীয়ত, প্রাতিষ্ঠানিক রাষ্ট্র সংস্কার কি কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে? চতুর্থত, রাজনৈতিক মতভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও ফ্যাসিবাদের উত্থান ঠেকাতে জাতীয় ঐকমত্য গড়ে তোলা সম্ভব হচ্ছে কি? পঞ্চমত, তরুণদের ইতিবাচক শক্তিকে রাষ্ট্রগঠনের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করার বাস্তবমুখি কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে কি? ষষ্ঠত, জুলাই শহীদ পরিবার এবং আহত জুলাইযোদ্ধাদের কৃতিত্বকে সঠিকভাবে মূল্যায়নের নিমিত্তে তাদেরকে দলীয় পরিচয়ের বাইরে রেখে জাতীয়ভাবে উপস্থাপনের পথে এগিয়ে যেতে পেরেছি কি? এসব প্রশ্নের উত্তরই ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও গণতান্ত্রিক বিকাশের দিকনির্দেশনা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

আমরা সকলেই বলে থাকি, জুলাই গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এর তাৎপর্য কেবল রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি নাগরিক চেতনা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, অংশগ্রহণমূলক রাজনীতি এবং রাষ্ট্র সংস্কার নিয়ে নতুন আলোচনার দ্বার উন্মোচন করেছে। ইতিহাস প্রমাণ করে, কোনো গণঅভ্যুত্থানের প্রকৃত সাফল্য কেবল তাৎক্ষণিক পরিবর্তনের মাধ্যমে নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, আইনের শাসন, জবাবদিহিতা, মানবাধিকার এবং অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়েই পরিমাপ করা হয়। দেশের আইনশৃঙ্খলা পুরোপুরি স্বাভাবিক না হওয়ায় চুরি, ডাকাতি ও মব জাস্টিসসহ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ রয়েই গেছে। ব্যাংকিং খাতের সংকট, ডলার সংকট এবং কর্মসংস্থানের অভাবসহ অর্থনৈতিক মন্দা এখনো কাটেনি। বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে স্টক এক্সচেঞ্জে উল্লেখযোগ্য সূচক উত্থান ঘটার সম্ভাবনা তৈরি হলেও তা ইতিবাচক সাড়া জাগাতে সক্ষম হয়নি। মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও বাজার নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতায় জনমনে ক্ষোভের সৃষ্টি করছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে অসাধু মজুদদারি ও দুর্বল বাজার ব্যবস্থাপনার কারণে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা অনেক কমে গেছে। বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ ও বিনিয়োগের গতি ধীর হওয়ায় আশানুরূপ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে না। ধাক্কা কাটিয়ে ওঠার মতো শিল্প উৎপাদন ও বেসরকারি বিনিয়োগ এখনো পূর্ণ গতি পায়নি। ব্যাংকিং খাতে ঋণ পুনঃতফসিলীকরণের মাধ্যমে খেলাপি ঋণের হার সাময়িকভাবে কিছুটা কম দেখানো হলেও ব্যাংকিং খাতের কাঠামোগত দুর্বলতা এখনো পুরোপুরি কাটেনি।

বাংলাদেশের সমকালীন পরিবেশ পরিস্থিতির আলোকে কয়েকটি বিষয়ের পর্যালোচনা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা জরুরি বলে বিশ্লেষক মহল মনে করে-
প্রথমত, আমাদের নতুন প্রজন্ম একটি বিপ্লব সংগঠিত করেছে। আমরাও সাথে ছিলাম। পরবর্তীতে এখানে অনেক ভুলত্রুটি এবং নৈতিক বিচ্যুতিও ঘটেছে। কেউ কেউ অনৈতিকভাবে ফায়দা লোটার চেষ্টাও করেছেন। এতো কিছুর পরেও, অন্তত সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের যে মানসিক উত্তরণ ঘটেছে সেটাও কম অর্জন নয়। মানসিক বিপ্লবটি ছিল সবচেয়ে বড় অর্জন। মানুষ বুঝতে শিখেছে যে রাষ্ট্র ও সমাজে মৌলিক পরিবর্তন সম্ভব। শুধু দরকার সংগঠিত শক্তি, সৎ নেতৃত্ব আর অটল মনোবল। নির্যাতিত জনগণের মুখে ফিরে এসেছে প্রতিবাদের ভাষা। ফ্যাসিবাদের পতন একটি বড় সফলতা। এটি অনেক বড় ব্যাপার। এখন আমরা ক্রমাগত যতগুলো ভালো নির্বাচন করে যেতে পারি, ততই আমাদের গণতন্ত্র পরিগঠিত হতে থাকবে। এখন প্রয়োজন ঐকমত্য। এখন প্রয়োজন দেশ গড়ার সুদৃঢ় সংকল্প। তরুণ প্রজন্ম রাজনীতির প্রতি আগ্রহী হয়েছে, দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে শুরু করেছে। চোখে চোখ রেখে অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে শিখেছে। এটি ছিল একটি চেতনার জাগরণ। এই ইতিবাচক দৃষ্টিভংগিকে পরিকল্পিত উপায়ে উত্তম খাতে প্রবাহিত করার সময় এখনো শেষ হয়ে যায়নি। এর জন্য রাজনৈতিক দলসহ দেশপ্রেমিক সকল নাগরিকের সচেতনতা দরকার, দরকার ঐক্যবদ্ধভাবে উন্নত পরিকল্পনার ভিত্তিতে কর্মপন্থা নির্ণয় করা।

দ্বিতীয়ত, এক মাহকাব্যিক বিপ্লবের নাম জুলাই। জুলাই বিপ্লবের পরে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের মতো নেতৃত্ব আবশ্যিক ছিল। আন্তর্জাতিক এবং সে সময়ের অভ্যন্তরীণ গ্রহণযোগ্যতা তাঁকে ছাড়া কঠিন হতো। তবে গণঅভ্যুত্থানের সরকার হবার কারণে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতায় আটকে ছিলেন তারাও। ফলে ফ্যাসিবাদী স্বার্থ আদায়ে নানামুখি নাটক প্রতিরোধ করা গেলেও সমূলে উৎপাটন করা যায়নি। তবে আশার দিক হচ্ছে জুলাইয়ের পক্ষের শক্তি হিসেবে জুলাইয়ের অন্যতম স্টেক হোল্ডার বর্তমানে নির্বাচিত জাতীয়তাবাদী সরকার দেশ পরিচালনা করছেন। বিরোধী দলে যারা আছেন তারাও লাল জুলাইয়ের বড় স্টেক হোল্ডার। জুলাইয়ের সম্মুখ সারির যোদ্ধা। জুলাই যুদ্ধের সেনাপতি। রাজনীতির ভাষা ও চরিত্র বদলে দেওয়ার অঙ্গীকার নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে তারাও। গণঅভ্যুত্থান সফল করার পর দু’চারটি পদস্খলন ছাড়া এখন পর্যন্ত প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়ে যাচ্ছে রাজনৈতিক দলগুলো। গণতন্ত্রের সৌন্দর্যই হলো ভিন্নমতের সহাবস্থান। কেউ সরাসরি সংস্কারের পক্ষে, কেউবা একটু ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে সংস্কার করতে চান- এটাই স্বাভাবিক হিসেবে ধরে নিতে পারি। কারণ মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কখনোই দমনীয় নয়। আর সেই সত্য মেনেই ভবিষ্যতের পথে এগোতে হবে। আমরা আর কখনো চাই না, কেউ গুম হোক, রাজপথে গুলিবিদ্ধ হোক, কিংবা ভিন্নমতের অপরাধে ভীতসন্ত্রস্ত জীবন যাপন করুক। সেই কারণে ঐকমত্যের ভিত্তিতে সংস্কারকে অবশ্যই গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করতে হবে।

তৃতীয়ত, গণতন্ত্রের প্রথম ধাপ নির্বাচন। সেই প্রতিষ্ঠানটিকে নষ্ট করেছিলো পতিত স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদীরা। ক্ষমতা রক্ষার জন্য গুম, খুন, আয়নাঘর, হামলা, মামলা এবং সর্বোপরি সকলের মুখে তালা ঝুলিয়ে কথা বলার অধিকারটুকুও খর্ব করা হয়েছিলো। এখন অন্তত কথা বলা শিখেছে এদেশের মানুষ। প্রতিবাদের ভাষা পেয়েছে, সাহস পেয়েছে। যে কোনো অপকর্ম সচিত্রভাবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছেড়ে দেবার মতো বুকের বল তৈরি হয়েছে। আগামীতে ক্ষমতায় যারাই আসবেন, পতিত ফ্যাসিবাদী সরকারের মতো অপ্রতিরোধ্য গতিতে অন্যায় করে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে পারবেন না। একটি প্রতিবাদী প্রেসার গ্রুপ সাহসের সাথে দাঁড়ানোর মতো সাহস তৈরি করতে পেরেছে। জনগণও দাঁড়িয়ে যাবার সক্ষমতা ফিরে পেয়েছে। রাজনৈতিক বর্ণচোরাদের মুখোশ উন্মোচন হয়েছে। জুলাই বিপ্লব দেখিয়ে দিয়েছে, ক্ষমতার জন্য যেসব দল ও নেতৃত্ব বারবার জনগণকে ব্যবহার করেছে, তারা আসলে জনগণের নয়, নিজের ক্ষমতা ধরে রাখার জন্যই মাঠে নামে। এই উপলব্ধি আগামী দিনের রাজনীতিকে অনেক বেশি সচেতন করবে। সামনের দিনে ক্ষমতার মসনদে টিকে থাকতে হলে সরকারকে যেমন জনবান্ধব হতে হবে তেমনি রাজনৈতিক দলগুলোকেও সচেনতার সাথে কর্মসূচি নিয়ে এগিয়ে যেতে যাওয়ার দক্ষতা ও সাহস সঞ্চার করতে হবে।

চতুর্থত, দুর্নীতি কিংবা যে কোন ধরনের সহিংসতার পুনরুত্থান দমাতে হলে একটি শক্তিশালী সরকার ব্যবস্থা দরকার। সরকার যখন ন্যায্যতার ভিত্তিতে শক্তিশালী অবস্থান গ্রহণ করে, তখন তার পেছনে জনসমর্থন থাকে। নির্বাচন জনসমর্থনের একটি পথ। জাতীয় নির্বাচনে খানিকটা প্রশ্ন উত্থাপিত হলেও স্থানীয় নির্বাচনগুলোকে অবশ্যই জনমতের ভিত্তিতে ‘ফেয়ার ইলেকশন’ হিসেবে নজির উপস্থাপন করতে হবে। এ জন্য সংস্কার খুব জরুরি। সংস্কার নিয়ে এখনো জনগণের সংশয় কাটেনি।

গণভোটের রায় বাস্তবায়ন এবং সংস্কারের দাবি এখন জনগণের মুখে মুখে। রাষ্ট্রযন্ত্রে গোঁড়ামি, প্রশাসনে দুর্নীতির করাল গ্রাস ও বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে উচ্ছেদ করতে গণভোটের রায় বাস্তবায়নের কোন বিকল্প নেই। তা না হলে আগের মতোই দমন-পীড়ন, মিথ্যা মামলা, অর্থনৈতিক বৈষম্য, দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন উর্ধ্বগতি সবকিছু ফ্যাসিবাদী উচ্ছ্বাসে এগিয়ে যাবে; সাধারণ মানুষের জীবন দুর্বিষহ করে তুলবে। গণভোটের রায় বাস্তবায়নের মধ্যদিয়ে জুলাই গণহত্যার আন্তর্জাতিক মানের বিচার নিশ্চিতকরণ, প্রণীত ‘জুলাই সনদ’র আইনী স্বীকৃতি, প্রয়োজনীয় সাংবিধানিক ও প্রশাসনিক সংস্কার এখন অনেকবেশি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু।

পঞ্চমত, জুলাই গণঅভ্যুত্থান বিশাল এক পালাবদল ও বাঁকবদলের নাম। এই একটি বছর ছিল শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি জগতের মুখোশ উন্মোচনের ও প্রকৃত মানুষ চেনারও। ইতোমধ্যে জুলাই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে দেশের শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতি অঙ্গনে সুস্পষ্ট বিভাজন সৃষ্টি হয়। পতিত স্বৈরাচারের সুবিধাভোগীরা ইতোমধ্যে জুলাই বিপ্লবকে সুকৌশলে পুরোপুরিভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন। অনেক কালচারাল ফ্যাসিস্ট এখন সাহসের সাথে মুখ খুলেছেন। মিডিয়ায় সরাসরি জুলাইয়ের বিরুদ্ধে কথা বলছেন। জুলাইকে সরাসরি ৭১ এর প্রতিপক্ষ হিসেবে উপস্থাপন করছেন। অথচ জুলাই এবং ৭১ কখনো প্রতিপক্ষ নয়। বরং ৫২ থেকে যেমন ৭১ এসেছে, তেমনি ৭১ থেকেই জুলাই চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান। এই কালচারাল ফ্যাসিস্টদের একটা বড় অংশ বিদেশে অবস্থান করছে। তারা বিদেশের মাটিতে বসে নিশ্চিন্তে পিঠ বাঁচিয়ে উল্টোপাল্টা কথাবার্তা লিখছেন। তারা জুলাই আন্দোলনের ছাত্র-জনতাকে ‘সন্ত্রাসী’ ‘জঙ্গি’ ইত্যাদি আখ্যা দিয়েই চলেছেন এখনো। তাদের বক্তব্যে মনে হয় ফ্যাসিবাদের পতন যেনো ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’, ‘স্বাধীনতা’ ও ‘গণতন্ত্র’ ধ্বংসের ফাঁদ। চোখের সামনে ছাত্র-জনতার লাশ দেখেও, আয়নাঘরের ভয়াবহতা দেখেও সেই প্রতিবন্ধী লেখক-বুদ্ধিজীবীরা জুলাই বিপ্লবের গণহত্যার বিষয়ে একটি লাইনও জনগণের পক্ষে লেখেননি। পার্শ্ববর্তী দেশের মিডিয়াগুলো উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ভুয়া খবরা-খবর প্রচার করছে। তাদের সাথে বাংলাদেশের কিছু মিডিয়া রীতিমতো কোমর বেঁধে নতুন নতুন কৌশলে জুলাইকে হেয় করতে করতে মিথ্যা ও বানোয়াট খবরা-খবর পরিবেশন করছে।

ষষ্ঠত, উপর্যুক্ত বক্তব্যের আলোকে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের সামনে কয়েকটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে- রাজনৈতিক সহনশীলতা প্রতিষ্ঠা। ভিন্নমতের প্রতি সম্মান বৃদ্ধি। আইনের সমান প্রয়োগ নিশ্চিত করা। অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। যুবসমাজের কর্মসংস্থান বৃদ্ধি। ডিজিটাল মাধ্যমে বিভ্রান্তিকর তথ্য মোকাবিলা। দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার বাস্তবায়নে গণভোটের রায় কার্যকর করা। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকার, রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ জনগণের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

সার্বিক বিচারে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের উত্তরাধিকার সংরক্ষণ এবং এর ইতিবাচক শিক্ষা বাস্তবায়নের জন্য সংলাপ, সহনশীলতা, গবেষণা এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করার বিকল্প নেই। এজন্য-
১. স্বৈরতন্ত্রের পুনরাবৃত্তি রোধে দেশের প্রতিটি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে জবাবদিহিমূলক ও শক্তিশালী করতে হবে।
২. বৈষম্যহীন সমাজ, মানবাধিকার ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রশ্নে জুলাই আন্দোলনের মূল শক্তি ছিল বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন। ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ নির্বিশেষে সবার সমান অধিকার ও নাগরিক স্বাধীনতার বিষয়টি এখন জাতীয় ভাবনার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।
৩. অর্থনৈতিক বৈষম্য দূরীকরণে মেধা ও যোগ্যতার সঠিক মূল্যায়নের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দ্রব্যমূল্যের লাগাম টেনে ধরতে সিন্ডিকেট ভাঙা এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত জরুরি।
৪. রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সংস্কারের মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন, বিচার বিভাগ, পুলিশ ও প্রশাসনকে দলীয়করণ মুক্ত করা এবং জুলাই হত্যাকাণ্ডের মূল হোতাদের বিচার এবং দুর্নীতিবাজদের আইনের আওতায় এনে বিচার সুনিশ্চিত করা।
৫. জুলাই গণঅভ্যুত্থানে প্রাণ হারানো শহীদ ও আহত ‘জুলাই যোদ্ধা’দের ত্যাগ জাতীয় ইতিহাসে সর্বোচ্চ সম্মানের আসনে রাখতে হবে এবং তাদের পুনর্বাসন ও চিকিৎসা নিশ্চিত করা এখন প্রধান সামাজিক দায়বদ্ধতা। সেইসাথে অবিলম্বে জুলাই যাদুঘর চালু করতে হবে।
৬. গণভোটের রায় কার্যকর করার জন্য বাস্তবমুখি পদক্ষেপ গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি। গণভোট জুলাই সনদ, বাস্তবায়ন করতে হবে।

পরিশেষে বলতেই হয়, জুলাই গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত। এর প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে আন্দোলনের আদর্শ কতটা বাস্তব নীতিমালা, সুশাসন, ন্যায়বিচার এবং জনগণের কল্যাণে প্রতিফলিত হয় তার উপর। ইতিহাসের শিক্ষা হলো- কোনো গণআন্দোলনের স্থায়ী মূল্য তখনই প্রতিষ্ঠিত হয়, যখন তা একটি অধিক ন্যায়ভিত্তিক, জবাবদিহিমূলক এবং গণতান্ত্রিক সমাজ গঠনে ইতিবাচক অবদান রাখে। তাই জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা ধারণ করে সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় একটি সমৃদ্ধ, শান্তিপূর্ণ ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ে তোলাই হওয়া উচিত আমাদের ভবিষ্যৎ অঙ্গীকার। ইতোমধ্যে দুটি বছর পার হয়ে গেছে। ফ্যাসিবাদী পতিত স্বৈরাচার শেখ হাসিনার বিচারিক প্রক্রিয়ায় এখনো সন্তোষজনক অগ্রগতি হয়নি। এখনো অনেক মায়ের কান্না থামেনি, অনেক বাবার চোখে এখনো ঝরছে আগুন। সফলতা ও ব্যর্থতার দোলাচালে তবুও বলতেই হয়, জুলাই বিপ্লব আমাদের মনে করিয়ে দেয় সত্য, সাহস ও চেতনার কণ্ঠ কখনো দমিয়ে রাখা যায় না। এই বিপ্লব শুধু অতীতের নয়, এটি ভবিষ্যতের জন্যও বার্তা বয়ে আনে। এই চেতনা হোক আগামী দিনের গণতান্ত্রিক সংগ্রামের অনুপ্রেরণা। তরুণদের বিশ্বাস, বলিষ্ঠ কণ্ঠ ও বিবেকী অবস্থানই বদলে দিতে পারে একটি জাতির ভবিষ্যৎ। জুলাই বিপ্লব আমাদের ফ্যাসিবাদ ও স্বৈরাচারমুক্ত বাংলাদেশ দিয়েছে। এখন দরকার স্বৈরাচারী আমলের চিন্তাভাবনা, পশ্চাৎপদ মানসিকতা, অন্য দেশের মুখাপেক্ষী মনোভাব, ক্ষমতার তোষণ, পদপদবি ও পুরস্কারের লোভ থেকে মুখ ফিরিয়ে দায়িত্বশীলতার দিকে এগিয়ে যাওয়া। শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চায় প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়াসহ প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে স্বাধীন দেশপ্রেমিক ও জনবান্ধব চিন্তাধারায় কাজ করতে হবে। জুলাই বিপ্লবের চেতনায় ন্যায্যতার ভিত্তিতে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার লক্ষে গণভোটের রায়ের ভিত্তিতে রাষ্ট্রসংস্কারের বিষয়টিকে যেমন গুরুত্ব দিতে হবে, তেমনি বাংলাদেশী সংস্কৃতি, শিল্প ও জীবনাচারের ভিত্তিতে সাংস্কৃতিক বিপ্লব ও শিল্পসংস্কার এখন সময়ের দাবি। আমরা পাশে আছি, সাথে আছি- ‘বিপ্লবী সাথীরা জেগে আছি রাস্তায় রাত দিন/স্বাপ্নিক নাবিকেরা স্বদেশের নির্মাণে হাত দিন।’

[লেখক: প্রফেসর, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।]


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category