• সোমবার, ৩১ অগাস্ট ২০২৬, ০১:২৬ পূর্বাহ্ন

দাখিলে পাবনা ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার অনন্য সাফল্য

পাবনা প্রতিনিধি: / ৪৩ Time View
Update : সোমবার, ১০ আগস্ট, ২০২৬

একটি ফলাফল কেবল কয়েকটি সংখ্যা কিংবা গ্রেডের হিসাব নয়; একটি ভালো ফলাফল আসলে একটি প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘদিনের শ্রম, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অধ্যবসায় এবং অভিভাবকদের প্রত্যাশার প্রতিফলন। আর সেই ফলাফল যখন শিক্ষার সঙ্গে নৈতিকতা, মানবিকতা ও পরিবেশের প্রতি দায়িত্ববোধের বার্তা বহন করে, তখন তা হয়ে ওঠে আরও অর্থবহ।

দাখিল পরীক্ষা-২০২৬-এর ফলাফলে সেই দৃষ্টান্তই যেন নতুন করে তুলে ধরেছে পাবনা শহরের ঐতিহ্যবাহী পাবনা ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসা। সারাদেশে মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের পাসের হার যেখানে ৫৫ দশমিক ৪৯ শতাংশ, সেখানে প্রতিষ্ঠানটির পাসের হার ৯৪ দশমিক ৮০ শতাংশ। ১৫৪ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে জিপিএ-৫ পেয়েছে ৪৬ জন। এ গ্রেড পেয়েছে ৬৪ জন, এ-মাইনাস ২৮ জন, বি ৬ জন এবং সি গ্রেড পেয়েছে ২ জন।

ফলাফলের পরিসংখ্যানকে আরও উজ্জ্বল করেছে বিজ্ঞান বিভাগের ৩৬ জন এবং সাধারণ বিভাগের ১০ জন শিক্ষার্থীর জিপিএ-৫ অর্জন। অর্থাৎ ইসলামি শিক্ষার পরিবেশে থেকেও বিজ্ঞান ও আধুনিক শিক্ষার সঙ্গে তাল মিলিয়ে মেধার উৎকর্ষ অর্জন সম্ভব—এই ফলাফল তারই উজ্জ্বল প্রমাণ।

কিন্তু এবারের সাফল্যের গল্প এখানেই শেষ নয়। ফল প্রকাশের দিন শিক্ষার্থীদের হাতে প্রচলিত উপহারের পরিবর্তে পরিবেশবান্ধব উপহার তুলে দিয়ে বৃক্ষরোপণে উৎসাহিত করার ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়েছেন মাদ্রাসার অধ্যক্ষ প্রিন্সিপাল ইকবাল হোসাইন। ফলাফলের আনন্দকে সবুজের আনন্দে পরিণত করার এই উদ্যোগ ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইতিবাচক প্রশংসা কুড়িয়েছে।

শিক্ষার্থীদের হাতে একটি উপহার তুলে দেওয়া হয়তো সহজ; কিন্তু সেই উপহারের মাধ্যমে একটি গাছ লাগানোর স্বপ্ন, একটি সবুজ ভবিষ্যতের প্রত্যয় এবং প্রকৃতির প্রতি দায়িত্ববোধ জাগিয়ে তোলা নিঃসন্দেহে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বৃহত্তর দায়িত্ববোধের পরিচয়। এ উদ্যোগ প্রমাণ করে, মাদ্রাসা শিক্ষা শুধু পাঠ্যবই ও পরীক্ষার ফলাফলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং নৈতিকতা, মানবিকতা, সামাজিক দায়িত্ব ও পরিবেশ সচেতনতারও শিক্ষা দিতে পারে।

প্রায় ২ হাজার ৫০০ শিক্ষার্থী এবং ৮৩ জন শিক্ষক-কর্মচারী নিয়ে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন ধরে পাবনার শিক্ষা অঙ্গনে স্বতন্ত্র অবস্থান ধরে রেখেছে। ধারাবাহিকভাবে ভালো ফলাফল অর্জনের পাশাপাশি বিভিন্ন সময়ে বিভাগীয় পর্যায়ে সেরা প্রতিষ্ঠানের স্বীকৃতিও পেয়েছে। ২০১১ সালে সারাদেশের মধ্যে দ্বিতীয় স্থান অর্জনের গৌরবও রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির ঝুলিতে।

১৯৯৩ সালে দারুন আমান ট্রাস্টের মাধ্যমে তৎকালীন জাতীয় সংসদ সদস্য ও রাজনীতিবিদ মাওলানা আব্দুস সুবহান পাবনা শহরে প্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই শিক্ষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও বিভিন্ন কল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ভূমিকা রেখে আসছে মাদ্রাসাটি। বর্তমানে মূল শাখার পাশাপাশি রয়েছে মহিলা শাখা। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়েও প্রতিষ্ঠানটির পরিচিতি রয়েছে।

প্রতিষ্ঠানের সভাপতি অধ্যক্ষ মাওলানা আব্দুস সামাদ বলেন, শিক্ষার্থীদের মেধার বিকাশের পাশাপাশি নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধে সমৃদ্ধ করে গড়ে তোলাই প্রতিষ্ঠানের অন্যতম লক্ষ্য। শিক্ষার্থীদের সাফল্যকে সমাজ ও পরিবেশের কল্যাণে কাজে লাগানোর এই উদ্যোগ ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।

প্রিন্সিপাল ইকবাল হোসাইন মনে করেন, “একজন শিক্ষার্থী শুধু ভালো ফল করবে—এটাই শেষ কথা নয়; তাকে ভালো মানুষ হতে হবে, সমাজের জন্য কাজ করতে হবে এবং দেশ ও পরিবেশের প্রতি দায়িত্বশীল হতে হবে।” তাঁর এই ভাবনার বাস্তব প্রতিফলনই যেন ফল প্রকাশের দিন শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দেওয়া পরিবেশবান্ধব উপহার।

মাদ্রাসা শিক্ষা নিয়ে প্রচলিত অনেক ধারণার বাইরে গিয়ে পাবনা ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার এই সাফল্য যেন একটি স্পষ্ট বার্তা দেয়—ইসলামি মূল্যবোধ ও আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের সমন্বয়ে গড়ে উঠতে পারে দক্ষ, মেধাবী, নৈতিক ও মানবিক প্রজন্ম। ধর্মীয় শিক্ষার সঙ্গে বিজ্ঞান, সাহিত্য, সংস্কৃতি, পরিবেশ সচেতনতা ও সামাজিক দায়িত্ববোধের সমন্বয়ই হতে পারে আগামীর মাদ্রাসা শিক্ষার শক্তিশালী ভিত্তি।

দাখিলের ফলাফলে সাফল্যের এই গল্প তাই শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের নয়; এটি মাদ্রাসা শিক্ষার সম্ভাবনারও গল্প। আর ফল প্রকাশের আনন্দে একটি গাছের চারা হাতে তুলে দেওয়ার মধ্য দিয়ে পাবনা ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসা যেন বলে দিল—শিক্ষার আলো যেমন ভবিষ্যৎ আলোকিত করে, তেমনি একটি গাছও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নির্মাণ করে নিরাপদ পৃথিবী।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category