প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, লক্ষ্যভিত্তিক এবং সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার মাধ্যমে যাকাত দেয়া হলে ১০ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে শুধুমাত্র যাকাত ব্যাবস্থাপনার মাধ্যমেই দেশে দারিদ্র বিমোচনে কার্যকর ভূমিকা রাখা সম্ভব। তিনি শনিবার আলেম, ওলামা এবং ইয়াতিমদের সম্মানে আয়োজিত ইফতার মাহফিলে একথা বলেন।
যমুনায় আয়োজিত ইফতার অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ইসলামী ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতি অনুযায়ী অতীতের প্রতিটি রামাদ্বানের প্রায় প্রতিদিনই আমরা বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষের জন্য ইফতারের আয়োজন করে আসছিলাম। আলেম ওলামা মাশায়েখ এবং ইয়াতিমদের সম্মানে আমরা সাধারণত পবিত্র রামাদানের প্রথম দিনেই ইফতার মাহফিলের আয়োজন করে থাকি।

তবে দেশের চলমান বাস্তবতায় এবার আমাদেরকে একটু দেরি করেই আপনাদের সঙ্গে নিয়ে ইফতারের আয়োজন করতে হয়েছে। তবে বৈশ্বিক পরিস্থিতিটির কারণে গ্যাস বিদ্যুৎ জ্বালানিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যায় সংকোচন এবং কৃচ্ছতা সাধনের অংশ হিসেবে এবারের রামাদ্বানে আজ এবং গতকালের ইফতার মাহফিলসহ মোট দুইটি ইফতার মাহফিলের আয়োজন করেছি।
বৈশ্বিক পরিস্থিতির উন্নতি না হলে এবারের রামাদ্বানে এটিই হয়তো শেষ ইফতার মাহফিল। আজকের এই ইফতার মাহফিলের অংশগ্রহণকারী ‘ইয়াতিম সন্তানেরাই’ আজকের সবচেয়ে গুরুত্ত্বপূর্ণ মেহমান। পবিত্র কোরআন এবং হাদিসে ‘এতিমের হক’ আদায়ের ব্যাপারে মুমিন মুসলমানদের প্রতি ইসলামের কঠোর নির্দেশনা রয়েছে।
ইয়াতিমের প্রতি ‘হক আদায়ে’র গুরুত্ব এবং ইয়াতিমদের নিয়ে আজকের এই ইফতার মাহফিলের আয়োজন।
আজকের এই ইফতার মাহফিলে সঙ্গত কারণেই সকল ‘ইয়াতিম’ সন্তানদেরকে আমন্ত্রণ জানানো সম্ভব হয়নি। তবে ‘ইয়াতীমদের ব্যাপারে রাষ্ট্র এবং সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরার ক্ষেত্রে এই ইফতার মাহফিলের অবশ্যই প্রতীকী তাৎপর্য রয়েছে। এই ইফতার মাহফিল ইয়াতীমদের প্রতি বিত্তবানদের দৃষ্টিভঙ্গি এবং দায় দায়িত্ব পালনের ব্যাপারে একটি ইতিবাচক বার্তা দেবে বলে আমি বিশ্বাস করি। প্রতিজন বিত্তবান যদি অসহায় এতিমদের প্রতি পবিত্র কোরান-হাদিসের নির্দেশনা অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করতে সচেষ্ট থাকেন…তাহলে আমি বিশ্বাস করি…পিতৃহারা এতিম সন্তানেরা এক বুক বেদনা বুকে নিয়েও রাষ্ট্র এবং সমাজে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা খুঁজে পাবে।
পবিত্র রামাদান ত্যাগ এবং সংযমের মাস। রহমত- বারকাত-সংযমের মাস। অথচ অপ্রিয় হলেও সত্য… রামাদ্বান আসলেই আমাদের কেউ কেউ নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বাড়িয়ে দেন। রামাদ্বান মাসকে লোভ-লাভের মাস বানিয়ে ফেলেন। পবিত্র রামাদ্বান মাসেও যারা অসাধু পন্থা অবলম্বন করছেন …আপনাদের প্রতি আমার বিনীত আহবান, অনুগ্রহ করে আপনারা মানুষের কষ্টের কারণ হবেন না।

সম্মানিত আলেম ওলামা মাশায়েখবৃন্দ, ইসলামের পাঁচটি ভিত্তির আরেকটি হচ্ছে যাকাত। দেশে যাকাত ব্যবস্থাপনা নিয়ে আমি আমার একটি পরিকল্পনার কথা আপনাদের সঙ্গে শেয়ার করতে চাই। ইসলামের বিধান অনুযায়ী আমাদের সমাজে অনেক বিত্তবান নিজ উদ্যোগেই যাকাত দিয়ে থাকেন। কেউ কেউ সরকারের ‘যাকাত বোর্ডের’ মাধ্যমেও যাকাত পরিশোধ করে থাকেন।
বিভিন্ন গবেষণা রিপোর্টে দেখা গেছে… প্রতি বছর বাংলাদেশে এই যাকাতের পরিমান ২০/২৫ হাজার কোটি টাকার বেশি হয়ে থাকে। কেউ কেউ এর পরিমান আরো অনেক বেশি বলেছেন। তবে সুপরিকল্পিত এবং সুসংগঠিতভাবে যাকাত বন্টন না করায় বিত্তবান ব্যক্তির যাকাত আদায় হয়ে গেলেও যাকাতের অর্থ দারিদ্র বিমোচনে কতটা ভূমিকা রাখতে সক্ষম হচ্ছে এটি একটি বড় প্রশ্ন।
যতদূর জানি, যাকাত দাতাদেরকে ইসলামী বিধান এমনভাবে যাকাত বন্টনে উৎসাহিত করে….যাতে একজন যাকাত গ্রহীতা প্রথম বছর যাকাত গ্রহণের পর পরের বছর আর যাকাত গ্রহণ করতে না হয়। বিশেষজ্ঞগণ বলছেন, পরিকল্পিতভাবে যাকাত বন্টন করা গেলে দারিদ্র বিমোচনে যাকাত যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করতে পারে। এমন বাস্তবতায় সরকার যাকাত ব্যবস্থাপনাকে আরো কার্যকর এবং লক্ষ্যভিত্তিক করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।
সম্মানিত উপস্থিতি ধনী দরিদ্র সবমিলিয়ে দেশে বর্তমানে পরিবারের সংখ্যা কমবেশি চারকোটি। এসব পরিবারগুলোর মধ্যে যদি দরিদ্র কিংবা হত দরিদ্র পরিবারগুলোকে চিহ্নিত করে প্রতিবছর পর্যায়ক্রমে ৫ লক্ষ পরিবারকে এক লক্ষ করে টাকা করে যাকাত দেয়া হয়…আমার বিশ্বাসএসব পরিবারগুলোর মধ্যে বেশিরভাগ পরিবারকে পরের বছর আর যাকাত নাও দিতে হতে পারে। লক্ষ্যভিত্তিক এবং সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার মাধ্যমে যাকাত দেয়া হলে ১০ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে শুধুমাত্র যাকাত ব্যাবস্থাপনার মাধ্যমেই দেশে দারিদ্র বিমোচনে কার্যকর ভূমিকা রাখা সম্ভব।
সম্মানিত ওলামা মাশায়েখবৃন্দ, দারিদ্র বিমোচনে যাকাত ব্যবস্থাপনার বিষয়টি আপনাদের কাছে যৌক্তিক মনে হলে এ ব্যাপারে বিত্তবানদের সচেতন করার ক্ষেত্রে আপনারা আলেম ওলামা মাশায়েখগণ সবচেয়ে বেশি ভূমিকা পালন করতে পারেন।
যাকাত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে দারিদ্র বিমোচন করার লক্ষ্যে দেশের শীর্ষস্থানীয় আলেম ওলামা, ইসলামিক স্কলার এবং সরকারি কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্টদের নিয়ে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের অধীনে বিদ্যমান ‘যাকাত বোর্ড’ কে পুনর্গঠন সম্ভব।
‘যাকাত’কে দারিদ্র বিমোচনে ব্যবহার করে ইসলামী বিশ্বে বাংলাদেশকে একটি মডেল হিসেবে উপস্থাপনের সুযোগ রয়েছে বলেও আমি মনে করি।
সম্মানিত ওলামা মাশায়েখ এবং আমার এতিম বন্ধুরা, পবিত্র ইফতার সামনে রেখে আমি বক্তব্য আর দীর্ঘায়িত করতে চাইনা। দেশ এবং জনগণের কল্যানে নেয়া প্রতিটি কর্মসূচি যেন আমরা সুন্দরভাবে বাস্তবায়ন করতে পারি, আল্লাহর দরবারে সেই প্রার্থনা জানিয়ে আমি আমার বক্তব্য শেষ করছি।